সপ্তাহ-মধ্যবর্তী ভাবনা ৩২ | ১৫.০৭.২০২৬

 কুকুরের আশ্রয়কেন্দ্র।

মালিনী শঙ্কর

ডিজিটাল ডিসকোর্স


ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ৭ই নভেম্বর ২০২৫-এ জনসমাগমপূর্ণ স্থান থেকে সমস্ত রাস্তার কুকুর সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেয়। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দেয় যে, সমস্ত কুকুরকে ধরে নিয়ম ও আইন অনুযায়ী টিকা দেওয়া ও বন্ধ্যাকরণ (neutering) করতে হবে অথবা আশ্রয়কেন্দ্রে রাখতে হবে এবং কোনোভাবেই জনবহুল স্থানে ছেড়ে দেওয়া যাবে না। নির্দেশনায় স্পষ্ট করা হয় যে, ‘জনবহুল স্থান’-এর অন্তর্ভুক্ত হলো স্কুল, হাসপাতাল, বাস স্ট্যান্ড, রেলওয়ে স্টেশন, ক্রীড়া কমপ্লেক্স এবং অনুরূপ অন্যান্য স্থান। তবে নির্দেশনায় এও বলা হয়েছে যে, টিকা দেওয়া ও বন্ধ্যাকরণ করা কুকুরদের আবাসিক এলাকায় ছাড়া যেতে পারে, যেখানে ঝুঁকি কম বলে বিবেচিত হয়। এই রায়ের আগে একটি নির্দেশ এসেছিল যাতে সমস্ত রাস্তার কুকুরকে নিধনের কথা বলা হয়েছিল... পরবর্তীতে ১৯শে মে ২০২৬-এর আদেশে আগের নির্দেশটি কিছুটা সংশোধন করা হয়। ওই আদেশে প্রাণী কল্যাণ সংস্থা ও ব্যক্তিগত আবেদনকারীদের সেই আবেদন খারিজ করে দেওয়া হয়, যারা ৭ই নভেম্বর ২০২৫-এর নির্দেশটি পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছিল। ৭ই নভেম্বরের সেই নির্দেশে জনবহুল এলাকা (যেমন—শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, বাস ডিপো, রেলওয়ে স্টেশন ইত্যাদি) থেকে আট সপ্তাহের মধ্যে রাস্তার কুকুর সরিয়ে ফেলার কথা বলা হয়েছিল। ১৯শে মে ২০২৬-এর আদেশে সুপ্রিম কোর্ট প্রাণী কল্যাণ সংস্থাগুলোর সেই আবেদনও প্রত্যাখ্যান করে, যারা ৭ই নভেম্বর ২০২৫-এর নির্দেশটি পরিবর্তনের মাধ্যমে রাস্তার সব কুকুরকে যথাযথ প্রক্রিয়ায় (টিকা ও বন্ধ্যাকরণ) আশ্রয়কেন্দ্রে স্থানান্তরের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে চেয়েছিল। উল্লেখ্য, ৭ই নভেম্বর ২০২৫-এর নির্দেশে পরিত্যক্ত রাস্তার কুকুরদের ‘ইউথেনেশিয়া’ বা করুণামৃত্যুর (ইচ্ছামৃত্যু) কথা বলা হয়েছিল, যা প্রাণীপ্রেমীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছিল।

সুপ্রিম কোর্ট জাতীয় ও রাজ্য মহাসড়ক থেকে ভবঘুরে গবাদি পশু ও অন্যান্য প্রাণী সরিয়ে ফেলারও নির্দেশ দিয়েছে। দুর্ঘটনা রোধ ও সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষকে এদের উপযুক্ত আশ্রয়কেন্দ্রে স্থানান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদালত সতর্ক করে দিয়েছে যে, এই নির্দেশ বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের মুখ্য সচিব ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগতভাবে জবাবদিহি করতে হবে। আদালত নির্দেশটি পুরোপুরি বাস্তবায়নের জন্য আট সপ্তাহের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে। রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোকে এই সময়ের মধ্যে বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দিতে হবে এবং পুরো প্রক্রিয়াটি তদারকির জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করতে হবে।

অবহেলা বা গাফিলতির কারণে আদালতের অবমাননা সংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়া বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতে পারে। রাস্তার কুকুর অপসারণ, বন্ধ্যাকরণ এবং স্থানান্তরের প্রক্রিয়াগুলো 'অ্যানিমেল বার্থ কন্ট্রোল (ডগস) রুলস, ২০২৩'-এর অধীনে পরিচালিত হয়; এই বিধিমালার লক্ষ্য হলো রাস্তার প্রাণীদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে মানবিক ও আইনসম্মত পদ্ধতি অনুসরণ করা।

স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে নিম্নলিখিত কাজগুলো করতে হবে: সরকারি বা সর্বজনীন স্থান নিয়মিত পরিদর্শন করা; বেড়া ও গেট দিয়ে এলাকা সুরক্ষিত করা; রাস্তার কুকুর ধরে আশ্রয়কেন্দ্রে স্থানান্তর করা; টিকাদান ও বন্ধ্যাকরণের নথিপত্র সংরক্ষণ করা; এবং আদালতের নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে নিয়ম মেনে চলার প্রতিবেদন দাখিল করা।

২০২৫ অর্থবছরে ভারতে রাস্তার কুকুরের সংখ্যা আনুমানিক ১৫.৩ কোটি। এই ১৫.৩ কোটি কুকুরই গৃহহীন ও অভিভাবকহীন। ভারতের আমলাতন্ত্র ও নীতিনির্ধারকরা 'ভূমি ব্যবহার নীতি'কে সরকারি নীতির অন্তর্ভুক্ত করেননি; ফলে পরিত্যক্ত রাস্তার কুকুর বা গবাদি পশুর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ তাদের কাছে কখনোই অগ্রাধিকার পায়নি। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং কুকুর-প্রেমী গোষ্ঠীর মধ্যে এ বিষয়ে তীব্র মতভেদ রয়েছে।

যেসব কুকুর-প্রেমী রাস্তার কুকুরদের আশ্রয় বা যত্ন নিতে না পেরে কেবল খাবার দিয়ে থাকেন, তারাও ঠিক ততটাই দায়ী—যতটা দায়ী সেই ব্যক্তিরা যারা গৃহপালিত নেকড়ের বংশধর (কুকুর)-কে রাস্তায় পরিত্যাগ করে।

তবে এদের মেরে ফেলা (ইউথেনাসিয়া) আরও বেশি দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ; কারণ এটি অন্য প্রাণীদের পরিত্যাগ করারই এক নিষ্ঠুর ধারাবাহিকতা মাত্র। রাস্তার সব কুকুরের বন্ধ্যাকরণ ও টিকাদানই হলো সবচেয়ে টেকসই ও সর্বোত্তম পদ্ধতি। অতীতে রাস্তার কুকুর ধরে মেরে ফেলার যে প্রথা ছিল, তা কেবল নিষ্ঠুরই ছিল না, বরং তাতে রাস্তার কুকুরের সংখ্যাও কমেনি।

তাই নীতিনির্ধারকদের এখন রাস্তার কুকুরদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্রের ব্যবস্থা করতে হবে। আশ্রয়কেন্দ্র মানেই খাঁচায় বন্দি করে রাখা নয়; বরং প্রতিটি কুকুরের জন্য পর্যাপ্ত খাবার, আশ্রয়, পানি ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যয়ের ভার নাগরিকদের ওপরই বর্তানো উচিত। কারণ, মানুষই হলো ঈশ্বরের সৃষ্টি এক চিন্তাশীল ও যুক্তিবাদী প্রাণী। গৃহপালিত নেকড়ের বংশধরদের যত্ন নেওয়ার মতো বুদ্ধি বা বিবেচনাবোধ যদি তাদের না-ই থাকে, তবে অন্তত রাস্তার কুকুরদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কর প্রদান করা তো তাদের ন্যূনতম দায়িত্ব।

যাই হোক, বিষয়টি ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনাকারীদের ব্যর্থতারই পরিচয় দেয়। মাথাপিছু ভূমি ব্যবহারের সঠিক পরিকল্পনা থাকলে মানুষের সভ্যতাজনিত সব প্রয়োজনই তো মেটানো সম্ভব হতো, তাই না? অথচ আজ মানুষ অবৈধ স্থাপনা ভাড়া দিয়ে নিজেদের আয় বাড়াচ্ছে... যা নাগরিক প্রশাসনের দুর্নীতিগ্রস্ত অবস্থারই এক দুঃখজনক ও হতাশাজনক চিত্র। ২০ বাই ৩০ ফুটের একটি প্লটে অন্তত ১০টি ছোট আবাসন ইউনিট (যার প্রতিটিতে রান্নাঘর আছে) এবং চারটি শৌচাগার তৈরি করা সম্ভব; এছাড়া ১০,০০০ লিটারের একটি পানির ট্যাংক দিয়ে প্রতিদিন অন্তত ১৬ জন মানুষের প্রয়োজন মেটানো যেতে পারে। অবশ্য সেখানে ১৫টি গাড়ি বা চারটি এসইউভি (SUV) রাখার মতো কোনো জায়গা থাকবে না।

তবে খাঁচায় বন্দি না করে খোলা জায়গায় বিপুল সংখ্যক (১৫৩ লক্ষ) রাস্তার কুকুরের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। যদি আমরা এর জন্য আলাদা জায়গা তৈরি করতে না-ও পারি, তবুও আসুন বিদ্যমান জায়গাটিকেই সব জীবের জন্য টেকসই উপায়ে কাজে লাগাই। বড় শহরগুলোতে—যেখানে প্রত্যেকেই পাঁচটি গাড়ি, তিনটি ফ্ল্যাট এবং অন্তত দুটি জমির মালিক হতে চায়—সেখানে একশ্রেণির মানুষ সবকিছুর ভাগ বসাতে চায়। ঠিক যেন সেই 'আরবীয় উট ও তাঁবুর' গল্পের মতো পরিস্থিতি...'b'-এর তাঁবুটি দ্রুত বর্ধনশীল শহরের সেইসব প্রান্তিক মানুষের (যাদের 'বুমটাউন র‍্যাটস' বা দ্রুত নগরায়নের শিকার বলা যেতে পারে) মানবাধিকার ও জীবিকার অধিকারের অভাবকেই প্রতিফলিত করে। গান্ধীজি যথার্থই বলেছিলেন যে, প্রাকৃতিক সম্পদ সবার প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম, কিন্তু লোভ মেটাতে নয়।

বস্তুত, গান্ধীজির চিন্তাধারাই জাতিসংঘ এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (SDGs) মূল ভিত্তি বা সনদের রূপ দিয়েছে।

লিঙ্কসমূহ:

https://advocategandhi.com/supreme-court-orders-removal-of-stray-dogs-from-public-spaces-a-comprehensive-legal-and-public-safety-overview/ 

https://advocategandhi.com/supreme-court-orders-removal-of-stray-dogs-from-public-spaces-a-comprehensive-legal-and-public-safety-overview/

Comments

Popular posts from this blog

Շաբաթվա կեսի խորհրդածություններ 31. 8.07.2026

주중 단상 31 (2026년 8월 7일)

تأملات میان‌هفته ۳۱. ۸.۰۷.۲۰۲۶