সপ্তাহ-মধ্যের ভাবনা ২৮, ১৭.০৬.২৬

পরিবেশের জৈব-সূচক (Bio-indicators)

মালিনী শঙ্কর

ডিজিটাল ডিসকোর্স ফাউন্ডেশন


আজ আমার মনের গভীরের উচ্ছ্বাস আর চেপে রাখতে পারছি না, একেবারে হৃদয় থেকে বলছি! বেঙ্গালুরু শহরের জনাকীর্ণ এলাকার ঠিক মাঝখানে, আমার বাড়ির সামনের ফুটপাতে থাকা ঘন পাতায় ঢাকা একটি গাছের ডালে আমি নিজের চোখে একটি 'পি-হেন' (pea-hen)—সাধারণ ভাষায় যাকে ময়ূরীর (female peacock) বলা হয়—লাফিয়ে উঠতে দেখলাম। অতিরিক্ত জনবসতিপূর্ণ ও ঘিঞ্জি বাসভানাগুডি এলাকাটি অবশ্য শহরের অন্যান্য অংশের তুলনায় বেশ সবুজ... কিন্তু গত পাঁচ দশক ধরে বাসভানাগুডিতে বসবাস করেও আমি কখনও কোনো ময়ূরী দেখিনি। কোভিড-১৯ লকডাউনের সময় নিকটবর্তী বনশঙ্করী এবং বেশ দূরের বিইএল (BEL) লেআউটের বাসিন্দারা ময়ূর, ময়ূরী এবং এমনকি চিতাবাঘের উপস্থিতির কথাও জানিয়েছিলেন... সেই লকডাউন আমাদের মতো পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রেমীদের সত্যিই এক দারুণ রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করেছিল!

আমি আমার এলাকার গাছপালা-ঘেরা পরিবেশে অনেক বড় বড় পাখি দেখেছি—যেমন কালো চিল বা পুরোনো দিনের সুন্দর সব বাসভানাগুডি বাংলোর চত্বরে ঘুরে বেড়ানো রাজহাঁস—কিন্তু ময়ূরী আগে কখনও দেখিনি।

আজ বাড়ির বাগানে বসে যখন প্রাণায়াম শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, তখন দেখলাম একটি বিশাল পাখি ঠিক উল্টো দিকের ফুটপাতের গাছের ডালে এসে বসল। প্রথমে আমি শুধু তার লেজটাই দেখতে পেয়েছিলাম; কারণ বাড়ির সামনের ফুটপাতে থাকা গুলমোহর গাছের একটি ডাল আমার দৃষ্টিপথ আড়াল করে রেখেছিল। তাই আমি ভালো করে দেখার জন্য ঘাড় বাঁকিয়ে উঁকি দিলাম। তার সবুজ রঙের গলা আর মাথায় তিনটি পালকের ঝুঁটি দেখে আমি আনন্দে ও বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়লাম। তার চোখগুলো ছিল নিঃসন্দেহে কোনো ময়ূরীর। আমি সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির পরিচারিকাকে ডেকে পাঠালাম যাতে সে-ও এসে দৃশ্যটি দেখতে পায়। ততক্ষণে ময়ূরীটি ঢালু ডাল বেয়ে কিছুটা নিচে নেমে এসেছিল, কিন্তু পরক্ষণেই সে আবার ওপরের দিকে উঠে গিয়ে আরও শক্তভাবে ডালটি আঁকড়ে বসল... এতে আমি তার চকচকে সবুজ গলাটি খুব ভালোভাবে দেখার সুযোগ পেলাম। আমরা দুজনেই স্পষ্ট বুঝতে পারলাম যে ওটা সত্যিই একটি ময়ূরী। এরপরই একটি সাধারণ কাক তাকে তাড়া করে এল... ময়ূরীটি তখন ক্ষিপ্রগতিতে আরও উঁচুতে উঠে গেল—গাছটি সম্ভবত একটি শিমুল (silk cotton) গাছ ছিল। এরপর আর বাড়ি থেকে তাকে দেখা গেল না। আমি আমার সেই প্রতিবেশীকে ডাকলাম যার বাড়ির সামনে গাছটিতে ময়ূরীটি বসেছিল। তিনিও বেরিয়ে এলেন, গাছটি ভালো করে দেখলেন, পাখিটিকে খুঁজে পেলেন এবং আরামে ঘুমানোরত অবস্থায় সেটির ছবি তুললেন।

ঘন গাছপালাযুক্ত শহুরে এলাকায় 'শিডিউল ১' (Schedule 1) তালিকাভুক্ত কোনো পাখির দেখা পাওয়া সত্যিই এক বিস্ময়কর ঘটনা। তবে এটি পরিবেশের অবক্ষয়েরও একটি সূচক: আমার আশঙ্কা, এই ঘন গাছপালাযুক্ত এলাকাটি ধীরে ধীরে শুষ্ক অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্রে (dryland ecosystem) পরিণত হতে চলেছে। ময়ূর বা ময়ূরী কেবল আর্দ্র চিরহরিৎ রেইনফরেস্টের উপস্থিতিই নির্দেশ করে না; বরং শুষ্ক ও রুক্ষ অঞ্চলের তৃণভূমির বাস্তুতন্ত্রের সাথেও এদের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এর অর্থ হলো, সবুজ বাসাবানাগুড়ির (Basavanagudi) কিছু অংশের ঘন সবুজ আচ্ছাদন ক্রমশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আর্দ্র চিরহরিৎ বনভূমিগুলো ঝোপঝাড় বা তৃণভূমির মতো শুষ্ক বাস্তুতন্ত্রে রূপান্তরিত হচ্ছে—যা মূলত মরুভূমি সৃষ্টির প্রক্রিয়ারই (desertification) ইঙ্গিত দেয়।

রাস্তার উল্টো দিকের ফুটপাতে (আমার বাড়ির ঠিক সামনে) ১৯৯৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আমার দাদুর প্রয়াণ-পরবর্তী শোকের সময়ে আমি একটি 'প্রাইড অফ ইন্ডিয়া' (Lagerstroemia speciosa) গাছ লাগিয়েছিলাম। আমার বাড়ির বাগানে পাখিদের ভিডিও ধারণকারী জনাব বিনোদ রাজার মতে, গাছটি এখন পাখিদের জন্য একটি একক-বৃক্ষ অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। শুধু পাখিই নয়, এই 'প্রাইড অফ ইন্ডিয়া' গাছে কাঠবিড়ালি, নিশাচর প্রাণী যেমন স্লেন্ডার লরিস (Loris lydekkerianus), বানর, বাদুড়, বার্ন আউল (barn owl) এবং হুটেড আউলের (hooted owl) উপস্থিতিও আমি নথিবদ্ধ করেছি।


এখন সময় এসেছে 'পার্ক প্রোটেকশন অ্যাক্ট' বা উদ্যান সুরক্ষা আইনের আওতায় এই সুউচ্চ গাছগুলোকে আইনি স্বীকৃতি ও সুরক্ষা দেওয়ার; কারণ এগুলি বিরল ও বিপন্ন বন্যপ্রাণীদের আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে। বিশাল শহুরে এলাকার মধ্যে আমাদের আশপাশের পরিবেশকে রক্ষা করার জন্য এটিই হতে পারে আমাদের ন্যূনতম পদক্ষেপ। জীববৈচিত্র্যের প্রতি দায়িত্ববোধের জায়গা থেকেই এই কাজ করা প্রয়োজন।

Comments

Popular posts from this blog

Midweek Musings 34, 29.07.2026

Wochenmitte-Gedanken 12 25.02.2026 Klimafreundliche Infrastruktur

Շաբաթվա կեսի խորհրդածություններ 31. 8.07.2026